বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া ২য় টেস্ট: মাত্র ৬৪ রানে অলআউট বাংলাদেশ, স্টার্কের তাণ্ডব

বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া ২য় টেস্ট

বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া ২য় টেস্ট ভয়াবহ ব্যাটিং ধস, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাত্র ৬৪ রানে অলআউট

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে ঐতিহাসিক জয়ের পর দ্বিতীয় টেস্টে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা গেল বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে। ম্যাকের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে মাত্র ৬৪ রানে অলআউট হয়েছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার বাঁহাতি পেসার মিচেল স্টার্কের ভয়ংকর বোলিংয়ের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ। মাত্র ১০ ওভারে ১২ রান দিয়ে ৬ উইকেট নিয়ে ম্যাচের প্রথম দিনেই বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়ের মূল নায়ক হয়ে ওঠেন স্টার্ক।

বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজের প্রথম টেস্টে ডারউইনে নয় উইকেটের ঐতিহাসিক জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। সেই জয়ের পর দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে দ্বিতীয় টেস্টে নেমেছিল নাজমুল হোসেন শান্তর দল। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় পাওয়ার পর বাংলাদেশের সামনে ছিল আরও বড় ইতিহাস গড়ার সুযোগ। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টের শুরুতেই অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের সামনে সেই আত্মবিশ্বাস যেন মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে যায়।

বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া ২য় টেস্ট টস জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠান কামিন্স

ম্যাকেতে টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। স্থানীয় কন্ডিশন ও পিচে শুরু থেকেই পেসারদের জন্য বাড়তি সহায়তা ছিল। সেই সুযোগটিই অসাধারণভাবে কাজে লাগান অস্ট্রেলিয়ার পেসাররা।

ইনিংসের প্রথম বল থেকেই বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরি করেন মিচেল স্টার্ক। নতুন বলে তাঁর গতি, সুইং এবং অতিরিক্ত বাউন্স সামলাতে বাংলাদেশের ব্যাটাররা বারবার সমস্যায় পড়েন। ম্যাচের প্রথম বলেই উইকেট নেওয়ার মাধ্যমে স্টার্ক বাংলাদেশের ইনিংসের জন্য অশনি সংকেত দিয়ে দেন।

Esports World Cup 2026: প্যারিসে ফাইনালের আগে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

শুরুতেই ধস, ১২ রানেই ৫ উইকেট

বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয় এতটাই দ্রুত আসে যে স্কোরবোর্ডে ১২ রান উঠতেই পাঁচটি উইকেট হারিয়ে বসে দল। একের পর এক ব্যাটার অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের সামনে পরাস্ত হন। বিশেষ করে স্টার্কের বাঁহাতি অ্যাঙ্গেল এবং বলের মুভমেন্ট বাংলাদেশের টপ অর্ডারের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের ব্যাটাররা অনেক সময় বলের লাইন বুঝে ওঠার আগেই শট খেলতে বাধ্য হন। ফলে এজ, বোল্ড এবং ক্যাচ—বিভিন্নভাবে উইকেট হারাতে থাকে সফরকারীরা। অস্ট্রেলিয়ার ফিল্ডাররাও শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক অবস্থানে ছিলেন এবং বাংলাদেশের ব্যাটারদের ওপর ক্রমাগত চাপ ধরে রাখেন।

স্টার্কের প্রথম স্পেলেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অস্ট্রেলিয়ার হাতে চলে যায়। তিনি মাত্র ২২ বলের মধ্যে পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন, যা টেস্ট ক্রিকেটে দ্রুততম পাঁচ উইকেট শিকারের তালিকায় অন্যতম দ্রুততম পারফরম্যান্স। শেষ পর্যন্ত তাঁর বোলিং ফিগার দাঁড়ায় ১০ ওভারে ১২ রান দিয়ে ৬ উইকেট

বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান ১৪!

বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়ের সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, দলের সর্বোচ্চ রান এসেছে ১১ নম্বরে ব্যাট করতে নামা শরিফুল ইসলামের ব্যাট থেকে। তিনি করেন মাত্র ১৪ রান। অর্থাৎ বাংলাদেশের কোনো স্বীকৃত টপ বা মিডল অর্ডার ব্যাটারই দুই অঙ্কের বড় ইনিংস খেলতে পারেননি।

এমন পরিস্থিতি টেস্ট ক্রিকেটে অত্যন্ত বিরল। সাধারণত একজন বা দুজন ব্যাটার প্রতিরোধ গড়ে তুললেও এদিন বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে সেই প্রতিরোধ দেখা যায়নি। অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের সামনে ব্যাটারদের টেকনিক, ধৈর্য এবং শট নির্বাচনে একাধিক দুর্বলতা প্রকাশ পায়।

মাত্র ৩৪ ওভারেই শেষ বাংলাদেশের ইনিংস

বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস স্থায়ী হয় মাত্র ৩৪ ওভার। শেষ পর্যন্ত স্কোরবোর্ডে যোগ হয় মাত্র ৬৪ রান। বাংলাদেশের এমন দ্রুত অলআউট হওয়ার পেছনে অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের পাশাপাশি ম্যাকের পিচের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ম্যাকের উইকেটে বল কিছুটা অতিরিক্ত বাউন্স করছিল এবং নতুন বলে সিম মুভমেন্টও দেখা যাচ্ছিল। অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা সেই সুবিধা কাজে লাগিয়ে নিয়মিত ভালো জায়গায় বল করেন। ফলে বাংলাদেশের ব্যাটারদের জন্য স্বাভাবিক ব্যাটিং করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক কামিন্স শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফিল্ড সেট করেন। একের পর এক স্লিপ ও ক্যাচিং পজিশনে ফিল্ডার রেখে তিনি বাংলাদেশের ব্যাটারদের ভুল করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন। পরিকল্পনাটি পুরোপুরি সফল হয়।

স্টার্কের ক্যারিয়ারের আরেকটি স্মরণীয় দিন

এই ম্যাচে মিচেল স্টার্ক শুধু বাংলাদেশের ইনিংস ধ্বংস করেননি, নিজের টেস্ট ক্যারিয়ারেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড যোগ করেছেন। প্রথম বলেই উইকেট নেওয়ার ঘটনা তাঁর ক্যারিয়ারে চতুর্থবার। একই সঙ্গে তিনি ২২ বলের মধ্যে পাঁচ উইকেট নিয়ে দ্রুততম পাঁচ উইকেট শিকারের তালিকায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন।

স্টার্কের ৬/১২ বোলিং ফিগার অস্ট্রেলিয়ার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ ডারউইনে বাংলাদেশের কাছে নয় উইকেটে হারের পর দ্বিতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার কাছ থেকে প্রয়োজন ছিল এমনই একটি জবাব। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ৬৪ রান অস্ট্রেলিয়াকে সেই জবাব দেওয়ার বড় সুযোগ করে দেয়।

বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ২য় টেস্ট শুরু কাল সকাল ৬টায়, সিরিজ জয়ের হাতছানি টাইগারদের

বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া ২য় টেস্ট অস্ট্রেলিয়ার জবাব

বাংলাদেশকে ৬৪ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর নিজেদের প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নামে অস্ট্রেলিয়া। দিনের শেষ পর্যন্ত স্বাগতিকরা কোনো উইকেট না হারিয়ে ৮ রান সংগ্রহ করে। ফলে স্টাম্পের সময় অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের চেয়ে ৫৬ রান পিছিয়ে ছিল, হাতে ছিল পুরো ১০টি উইকেট।

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ওপেন করতে নামেন ম্যাট রেনশ এবং ট্রাভিস হেড। রেনশ ৪ ও হেড ৪ রানে অপরাজিত থেকে দিনের খেলা শেষ করেন। বাংলাদেশের বোলারদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দ্রুত উইকেট তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার লিড বড় হতে না দেওয়া।

প্রথম টেস্টের স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র

ডারউইনের প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ ব্যাট-বল দুই বিভাগেই দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলেছিল। প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করে অস্ট্রেলিয়ার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছিল তারা। পরে অস্ট্রেলিয়াকে দুই ইনিংসেই অলআউট করে ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।

কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে সেই দলের ব্যাটিংয়ের সঙ্গে কোনো মিল পাওয়া যায়নি। মাত্র ৬৪ রানে অলআউট হওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা। বিশেষ করে সিরিজ জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার পর এমন ব্যাটিং বিপর্যয় দলের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

তবে টেস্ট ম্যাচ এখনও অনেক বাকি। পাঁচ দিনের ম্যাচে একটি খারাপ সেশন পুরো ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে না। বাংলাদেশের বোলাররা যদি অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে দ্রুত আঘাত করতে পারেন, তাহলে ম্যাচে ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ

দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো দ্রুত এই বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসা। ৬৪ রানের মতো ছোট স্কোরের পর ম্যাচে ফিরে আসতে হলে বোলারদের অসাধারণ পারফরম্যান্স করতে হবে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস যত দ্রুত সম্ভব শেষ করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম টেস্টের ঐতিহাসিক জয় বাংলাদেশকে সিরিজ জয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টের শুরুতেই অস্ট্রেলিয়া যে ভয়ংকরভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তাতে সিরিজের লড়াই নতুন মাত্রা পেয়েছে। স্টার্কের বিধ্বংসী স্পেল অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচের চালকের আসনে বসিয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো—একটি শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ান দলের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের এত বড় সুযোগ তৈরি হওয়ার পর নিজেদের ব্যাটিং থেকেই এমন বিপর্যয় এসেছে। এখন ম্যাচের পরবর্তী দিনগুলোতেই বোঝা যাবে, এই ৬৪ রানের ধাক্কা সামলে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারে কি না।

ম্যাচ পরিস্থিতি: বাংলাদেশ ৬৪ অলআউট; অস্ট্রেলিয়া দিনের শেষে ৮/০।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ: শরিফুল ইসলাম – ১৪ রান।
অস্ট্রেলিয়ার সেরা বোলার: মিচেল স্টার্ক – ৬/১২।
ভেন্যু: গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনা, ম্যাকে।
সিরিজ পরিস্থিতি: বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট জিতে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *